অস্থির ঈশ্বরদীর চালের মোকাম: প্রতিদিনিই বাড়ছে দাম

মে ২৩, ২০১৭

আপনি দেখছেন: দেশের খবর >> কৃষি, পাবনা, স্থানীয় শীর্ষ >> অস্থির ঈশ্বরদীর চালের মোকাম: প্রতিদিনিই বাড়ছে দাম

স্বপন কুমার কুন্ডু, ঈশ্বরদী (পাবনা): উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম চালের মোকাম ঈশ্বরদীতে প্রতিদিনই বাড়ছে চালের দাম। এতে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। অপরদিকে খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করতে না পেরে হাসকিং মিল মালিকরাও বেকায়দায় পড়েছেন।

চাল ব্যবসায়ীরা জানান, বিগত ১৫ বছরের মধ্যে চালের দাম এতো অধিক পরিমাণে বাড়েনি। গত ইরি-বোরো-মৌসুমে মিনিকেটের দাম ছিল (৮৪ কেজি) ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকা, বিআর-২৮ চলের দাম ছিল ২,০০০ থেকে ২,১০০ টাকা, বাসমতির দাম ছিল ২,৯০০ থেকে ৩,১০০ টাকা এবং মোটা চালের দাম ছিল ১৭ থেকে ১৮ টাকা কেজি। চলতি-মৌসুমে এই চালের দাম বেড়ে মিনিকেট (৮৪ কেজি) ৩,৬০০ থেকে ৩,৭৫০ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৩,৪৫০ থেকে ৩,৫৫০ টাকা, বাসমতি ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ টাকা এবং মোটা চাল ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

জয়নগন মোকামের ব্যবসায়ীরা বলছেন, শক্ত নজরদারির অভাবেই বাজার চড়া। উপজেলা ধান চাউল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মজিবর রহমান মোল্লা জানান, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন কম এবং কিছু কিছু মোকামে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেইসাথে সারাদেশে অটোরাইচ মিল মালিকরা বিপুল পরিমাণে ধান ক্রয় করার মজুদ গড়ে তোলায় ধানের দাম বেড়েছে। মজিবর রহমান মোল্লা আরো জানান, চালের দাম কমাতে হলে অতিসত্বর সরকারের এলসির উপর ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে।

জয়নগন মোকামের মিল মালিক মেসার্স সম্পদ ট্রেডার্সের মালিক আলহাজ্ব শামসুল আলম জানান, ঈশ্বরদী খাদ্যগুদামের ইরি-বোরো চাল সংগ্রহ-২০১৭ মৌসুমে ১৫ দিনে ৪৬,৯৬৬ মেট্রিকটন ধান ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে। সরকারের সংগ্রহ অভিযানে এবারে প্রতি কেজি ধান ২৪ টাকা এবং চাল ৩৪ টাকা কেজি ধার্য করা হয়। চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদীর দুটি খাদ্যগুদামে হাসকিং মিল মালিকদের চাল সরবরাহের জন্য চুক্তি করতে ১৮,৪১২ মেট্রিকটন বরাদ্দ দেয়া হয়। গত ২০শে মে মিলারদের চুক্তি সম্পাদনের শেষ দিন থাকলেও ঈশ্বরদীর কোন মিলারই চুক্তিপত্র করেননি।

অর্থাৎ এই অবস্থায় ঈশ্বরদী খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ না হলে সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হবে। ফলে চালের দাম বেড়েই যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকার ইতোমধ্যে মিলারদের চুক্তি সম্পাদনের জন্য আগামী ৩০মে পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে। কিন্তু মিলাররা বর্তমান বাজারে ধান কিনে চাল তৈরি করে সরবরাহ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এই হিসেব কষে কেউই চুক্তি করতে রাজী হচ্ছে না। এ বিষয়ে মিল মালিকরা জানান, বর্তমান বাজারে ধান কিনে ৩৪ টাকা কেজি দরে চাল গুদামে সরবরাহ করলে কেজি প্রতি চালের দাম পড়বে ৩৭-৩৯ টাকা। এতে মিলারদের প্রতি কেজিতে ৪-৫ টাকা ক্ষতি হবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং মিল সমিতি সোমবার ঢাকায় বৈঠকে বসেছে বলে তিনি জানান। মিল মালিকরা দাবি করেন, গুদামে ওই দামে চাল সরবরাহ করলে সরকারকে প্রতি কেজিতে ৫-৬ টাকা উৎস বোনাস দিতে হবে। তাহলে সরকারের চলতি সংগ্রহ অভিযান সফল হতে পারে বলে মিল মালিকরা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ঈশ্বরদীতে সাত শতাধিক হাসকিং মিল এবং ৮টি অটোরাইচ মিল রয়েছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা চাউল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং চাল আমদানিকারক আলহাজ্ব মোঃ খায়রুল ইসলাম জানান, হাওর তলিয়ে যাওয়ার কারণে বেশ কিছু ধানের মোকাম নষ্ট হয়েছে এবং ধানের ফলনও কম হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে সারাদেশে অটোমিল মালিকরা অধিক হারে ধান ক্রয় করার কারণে সাধারণ হাসকিং মিলের ব্যবসায়ীরা ধান পাচ্ছেন না। অটোমিলের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদেরকেও অধিক দামে ধান ক্রয় করতে হচ্ছে। ফলে চালের দাম উচ্চহারে প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি জানান, দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের চালের দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য সরকারের দ্রুত এলসি ভ্যাট প্রত্যাহার করে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। নইলে বর্তমান চাউলের বাজার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটাই দেখার বিষয়। বিগত কয়েকবছর দেশ খাদ্যে স্বংয়সম্পূর্ণ। এবারে ধানের উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি হাওর অঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় অসময়ে বৃষ্টিপাতের জন্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন লক্ষমাত্রা ছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন।

চাল ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমান টালমাটাল বাজার কোথায় কখন কি অবস্থায় দাাঁড়বে তা  বলতে পারছি না। মিলাররা জানান, সারাবছর উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অধিক দামে ধান ক্রয় করতেও ভয় পাচ্ছি। অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে মিল মালিক এবং চাল ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় লাভ করতে পারছে না বলে জানান। কারণ যে কোন সময় এলসি ভ্যাট প্রত্যাহার হলে চালের বাজার অনেকটাই কমে যাবে। তখন বিপুল পরিমাণ লোকসানের আশংকা রয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *