মেহেদীর সংগ্রাম, মেহেদীর সাফল্য

মে ৮, ২০১৭

আপনি দেখছেন: দেশের খবর >> টাঙ্গাইল, প্রধান খবর, শিক্ষা-সংস্কৃতি >> মেহেদীর সংগ্রাম, মেহেদীর সাফল্য

আব্দুল্লাহ আবু এহসান, মধুপুর (টাঙ্গাইল): এসএসসির ফলাফল ঘোষণাকে ঘিরে ৪ মে সারা দেশের পরীক্ষার্থী-অভিভাবক-শিক্ষকদের মধ্যে কম-বেশি উত্তেজনা। দুপুরের পর ফল ঘোষণা হলো। ফলাফল কারো জন্য খুশির জোয়ার বয়ে আনল। কারো জন্য কিছুটা আফসোস। ইস্‌, আর একটু যদি ভালো করতে পারতাম! ফল খারাপ করে কেউ বা অশ্রুপাত করেছে।

লাখো পরীক্ষার্থীর মতো মেহেদী হাসানের কাছেও পরীক্ষার ফল পৌঁছাল। মেহেদী তখন ধান কাটায় ব্যস্ত। সেই সপ্তম শ্রেণি থেকে অন্যের জমিতে দিনমজুর খাটা তার জন্য নিয়মিত ব্যাপার। না হলে মা-বোনের যে উপোস করতে হবে। চার বছর ধরে পরিবারের প্রধান রোজগেরে সে।

মেহেদী হাসান।

এতটা দারিদ্র্যের ভেতরেও লেখাপড়াটা ঠিকঠাক চালিয়ে নিয়েছে মধুপুরের লাহিড়ীবাড়ী গ্রামের স্বপ্নবাজ ছেলেটি। তার স্বপ্ন– ভালো ফলাফল করে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়া। অভাবী সংসারটাকে একটু ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া। মেহেদীর অবস্থা জানলে যে কেউ বলবে– জিপিএ ৪.৯৫ ওর জন্য অনেক ভালো ফলাফল। মেহেদী, তার শিক্ষক আর সহপাঠীদের প্রত্যাশা ছিল জিপিএ ৫।  বাংলায় এ প্লাস না আসায় মেহেদী ভীষণ অবাক হয়েছে। মেহেদীর জানায়, পরীক্ষা যে রকম হয়েছে তাতে বাংলায়ও এ প্লাস পাওয়া উচিত ছিল। চাপড়ী বহুমুখী গণ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখা থেকে পরীক্ষা দেওয়া আত্মবিশ্বাসী ছেলেটি বোর্ডের কাছে উত্তরপত্র পুনর্মুল্যায়নের আবেদন করেছে।

মেহেদী জানায়, ২০১৩ সালে তার বাবা শাহজাহান মারা যান। সেদিন ছিল কোরবানির ঈদ। মেহেদী তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বসতভিটা ছাড়া তাদের কোনো সম্পদ নেই। মা মনোয়ারা বেগম সেলাইয়ের কাজ করেন, তবে মায়ের তেমন রোজগার নেই। মা আর ছোট বোন সুমার জন্য সংগ্রামে নেমে পড়ে মেহেদী।

সংসার আর নিজের পড়ার খরচ চালাতে দিনমজুরের কাজ শুরু করে মেহেদী। শুক্রবার আর অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে সে দিনমজুরি করত। ধান কাটার মৌসুমে স্কুলে না গিয়ে অন্যের জমিতে ধান কাটত। এজন্য স্কুল তাকে প্রতিদিন অনুপস্থিতির জন্য ২০ টাকা জরিমানা করত। টাকা দিতে পারত না সে। শিক্ষকদের পিটুনি খেয়ে জরিমানা শোধ করতো সে। এসএসসি পরীক্ষার পর সাভারের নিউ মার্কেট এলাকায় এসে বেশ কিছু দিন রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করে সে।

মেহেদী জানায়, সকালে সামান্য খাবার খেয়ে এসে সারাদিন স্কুল করত। টিফিনের সময় টিউবওয়েলের পানি পান করে কাটিয়ে দিত। তবে কখনো কখনো সহপাঠীরা তাকে টিফিন খাওয়াত। অন্যের বাড়িতে দাওয়াত আর ঈদের দিন ছাড়া কখনো মাংস খাওয়া হতো না। সরকারের বিনামূল্যের বইয়ের বাইরে পুরোনো, ধার করা বা কারো দেওয়া বইই ছিল তার সম্বল। টেস্ট পেপার দিয়ে ছিলেন আব্দুল মালেক নামের এক শিক্ষক। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই জেনে ভালো ছাত্রের কারণে বিদ্যালয়ের নাসির স্যার বিজ্ঞানের সব বিষয় ফ্রি পড়িয়েছেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল মেহেদী। এসএসসিতেও জিপিএ ৫ পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। কিন্তু ভালো পরীক্ষা দিয়েও সেটি না পাওয়ায় কিছুটা  চিন্তিত সে। চিন্তা তার ভবিষ্যত নিয়েও, অভাবের সাথে লড়াই করে কীভাবে এগিয়ে যাবে সে?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *