রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প উন্নয়নের মাইলফলক, অভিমত বিশিষ্টজনদের

মে ২৬, ২০১৭

আপনি দেখছেন: দেশের খবর >> জাতীয়, পাবনা, প্রধান খবর >> রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প উন্নয়নের মাইলফলক, অভিমত বিশিষ্টজনদের

স্বপন কুমার কুন্ডু ; ঈশ্বরদী (পাবনা): রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে সরকারের উন্নয়নের মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন জনপ্রতিনিধসহ বিশিষ্টজনেরা। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সবার দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেছেন তারা।

প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে গৃহীত বিভিন্নজনের সাক্ষাৎকারে এমন অভিমত উঠে আসে।

অর্ধশতাব্দী আগে গৃহীত এ প্রকল্প বর্তমান সরকারের আমলে বাস্তবায়ন হচ্ছে।  এ নিয়ে  মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও ঈশ্বরদী নাগরিক মঞ্চের  সভাপতি অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো উপায় নেই। পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যাটোমিক বললেই মনে হয় জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকি পারমাণবিক বোমা হামলার কথা। এ কারণে মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক। তবে পারমাণবিক প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছে। তাই পরিবেশ বা জনগণের উপর এটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে না’।

প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার রয়েছে জানিয়ে আবুল কালাম আরো বলেন– রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এই প্রকল্প বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে এখনও তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহন চোখে পড়েনি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচারণার জন্য শিক্ষকদের দায়িত্ব নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়নি। প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বর্তমান কর্মকাণ্ডে এলাকার ৫-৬ হাজার শ্রমিক ইতোমধ্যেই নিয়মিত কাজ করছে। এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ থাকলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠে। এখানে ইপিজেড রয়েছে। এই প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুতের সরবরাহ শুরু হলে ইপিজেড-এর পরিধি বাড়ার পাশাপাশি আরো অনেক নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে।

পাকশী রেলওয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা ইমরুল কায়েস তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, জন্মের পর হতে এই প্রকল্পের কথা শুনে আসছি। অনেক আগের এই প্রকল্পের দ্রুত নির্মাণ কাজ দেখে আজ আমরা আশ্বস্ত। যেভাবে কাজ চলছে তাতে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।  তিনি বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রূপপুর ও পাকশীর চেহারা বদলে যাবে। তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এলাকার এবং দেশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। এলাকায় পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। জনগণের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সরকার এই ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতো না বলে মনে করেন তিনি । তিনি বলেন, জনসচেতনতা তৈরিতে সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করায় প্রকল্প নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে । কেউ বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, আবার কেউ ভাবছেন, এলাকায় আর থাকা যাবে না, লিক করে রেডিয়েশন বাইরে আসবে ইত্যাদি । এসব বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সেমিনার, সভা বা কর্মশালার আয়োজন করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন মোস্তফা ইমরুল।

পাবনা জেলা পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম বাবু মন্ডল বলেন,  শেখ হাসিনা সরকারের ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অবশ্যই দেশের বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রধিকার দিতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুতের বিকল্প নেই বলে তিনি জানান। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ‘উন্নয়নের মাইলফলক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস প্রকল্পের কাজ যথাসময়েই শেষ হবে। জনমনে বিভ্রান্তি, সংশয় এবং ভয়ভীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এলাকাবাসীর মনে ভয়ভীতি বা কোনো আশঙ্কা থাকলে অবশ্যই এতাদিনে জনগণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতো। এসময় তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞা পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান থাকাকালীন রূপপুর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এলে স্থানীয় জনগণ তাঁকে সংবর্ধনা দিয়ে এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানায়। সে সময় তিনি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে বলে জনগণকে আশ্বস্তও করেছিলেন। প্রকল্পে এলাকাবাসীর কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রকল্পের পরিচালক ড. সৌকত আকবর স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের বিষয়টি ইতোমধেই নিশ্চিত করেছেন । তিনি আরো জানান, এই প্রকল্পের জন্য প্রথম ১৯৬২ সালে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সেসময় প্রকল্প এলাকার বাসিন্দাদের অন্যত্র জায়গা-জমি দেয়া হলেও দালিলিকভাবে জমি হস্তান্তরিত হয়নি। সুদীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রকল্পের চুক্তির সম্পাদনের পরই ওইসব জমি প্রকল্পের খরচে ভুক্তভোগীদের দলিল সম্পাদন করে হস্তান্তর করা হয়। এজন্য তিনি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান এবং প্রকল্প পরিচালকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়া আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরম বন্ধু। এই বন্ধু আবারো বাংলাদেশের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে।  অত্যাধুনিক পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রযুক্তি রাখা হয়েছে প্রকল্পে। এতে বিকিরণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকবে না বলে মনে করেন তিনি।

পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামূল হক বিশ্বাস বলেন, মিত্র দেশ রাশিয়া যেভাবে নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে এবং দেশের মানুষ সুফল ভোগ করবে।  এই প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই বলে তিনি জানান। তবে এলাকার মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন  কর্মসূচির আয়োজন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আগেই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এমন নজির আর কোনো প্রকল্পে নেই। এলাকাবাসীরা নিজের স্বার্থের চেয়ে স্বপ্ন পূরণের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বলে তিনি জানান। ক্ষতিপূরণ নিয়ে তিনি বলেন,  নতুন অধিগ্রহণকৃত চর এলাকার ৮০০ একর জমিতে যারা চাষাবাদ করতো তাদের ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও তারা এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। এছাড়া জনসাধারণের নিজস্ব আরো ১৯ একর জমির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এখনো হয়নি। এসব জমিতে ইতোমধ্যেই প্রকল্পের ৭০ ভাগ কাজ সম্পাদন হয়েছে বলে তিনি জানান। অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য তিনি দাই জানিয়েছেন।

এলাকার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও রূপপুর হাই স্কুলের শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, আমি এই প্রকল্পে নেতিবাচক কিছু দেখছি না। রূপপুরের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমরা রূপপুরবাসী এখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। এসময় তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

পরিবেশ ও জনগণের উপর প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, জনসচেতনা তৈরির জন্য আমি ইতোমধ্যেই এই প্রকল্পের উপর গান রচনা করেছি। যা প্রকল্পের বিগত পহেলা বৈশাখ উৎসব পালন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়েছে। সহােযগিতা পেলে এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে জনসচেতনা তৈরির কাজে তিনি নিজেও যুক্ত থাকবেন বলে জানান।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *