সময়মতো চিকিৎসা ও অক্সিজেনের অভাবে ধর্মীয় শিক্ষক ও ঈমামের মৃত্যুর অভিযোগ

জুলাই ২, ২০১৭

আপনি দেখছেন: দেশের খবর >> অন্যান্য সংবাদ, বাগেরহাট, স্থানীয়, স্বাস্থ্য >> সময়মতো চিকিৎসা ও অক্সিজেনের অভাবে ধর্মীয় শিক্ষক ও ঈমামের মৃত্যুর অভিযোগ

জাহিবা হোসাইন, মোংলা (বাগেরহাট): মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসার অভাবে একজন ধর্মীয় শিক্ষক ও মসজিদের ঈমামের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনেরা। এ ঘটনায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও মসজিদের ঈমামদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে সময়মতো ডাক্তার না থাকায় চিকিৎসার অভাবে এ শিক্ষক ও ঈমামের মৃত্যুতে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি নানা কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়েছেন স্কুল, মাদ্রাসার শিক্ষক ও ঈমামেরা। অতি শীঘ্রই হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধির জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

সোনালী ব্যাংকের মোংলা শাখার ক্যাশিয়ার মো: সিরাজুল ইসলাম ও নিহতের পরিবার জানান, টি, এ ফারুক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধর্মীয় শিক্ষক ও ট্রেডার্স জামে মসজিদের পেশ ঈমাম মাওলানা খলিলুর রহমান জিহাদী অসুস্থ হয়ে পড়লে শুক্রবার দিবগত রাত ১২ টার দিকে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। হাসপাতালে গিয়ে ওই সময় ডিউটি ডাক্তার মো: রাফিউল হাসানকে না পেয়ে বার বার তাকে ডাকার জন্য তার কোয়ার্টারে যাওয়া হয়। তিন বার তাকে ডাকা হলেও বেশ কিছুক্ষণ পরে তিনি হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালে এসে খলিলুর রহমানকে অক্সিজেন দিতে হবে বলে তার স্বজনদের জানান। হাসপাতালের একটি মাত্র অক্সিজেন বিকল থাকায় তাকে অক্সিজেন দেয়া সম্ভব হয়নি। ডাক্তার না থাকায় সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিতে না পারার কারণে খলিলুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার পরিবারের সদস্য ও তার সহকর্মীরা।

এ বিষয়ে শুক্রবার রাতে কর্তব্যরত থাকা মেডিকেল অফিসার রাফিউল হাসান বলেন, খলিলুর রহমান জিহাদীর ফুসফুসে কাজ করছিল না। তারপরও তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালের একটি মাত্র অক্সিজেনে প্রেসার না থাকায় তাকে ওই সময় অক্সিজেন লাগানো যায় নি। তিনি আরো বলেন, হাসপাতালের সামর্থ্য সীমিত, আইসিইউ নাই, পানি সরবরাহ নেই, এক্সে ও আল্ট্রসোনোগ্রাফি যন্ত্র নষ্ট।

চিকিৎসার অভাবে রোগী মারা যাওয়ার বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার সুদীপ বালার কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনও কথা না বলে নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, হাসপাতালে একটি মাত্র অক্সিজেন বোতল, বোতলের অক্সিজেনও শেষ হয়ে গেছে। ফলে শুক্রবার রাতে অসুস্থ হয়ে আসা খলিলুর রহমানকে অক্সিজেন দেয়া সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কামরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, আমি আমার বাবাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু সময়মত ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। নার্সদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ডাক্তাররা ঈদের ছুটিতে। এছাড়া হাসপাতালের কেবিন নোংরা, বাথরুমে ময়লায় ভর্তি, দুর্গন্ধে কেবিনে থাকার মত অবস্থা নেই।

মো: আবুল কালাম বলেন, হাসপাতালে খাবার পানি ও বাথরুমের পানি নাই। কোন মেশিনও নেই। সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাহির থেকে করতে হয়। সামান্য হাত পা কেটে গেলেও বলে খুলনায় নিয়ে যান। আমরা মুলত এখান থেকে কোন চিকিৎসাই পাচ্ছি না।

সরেজমিনে শনিবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে জানা গেছে, পাচজনের জায়গায় মাত্র দুইজন ডাক্তার রাফিউল হাসান ও সুদীপ বালা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। বাকীদের কেউ অসুস্থ, কেউ ছুটিতে রয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: মাহবুবুল আলম বলেন, খলিলুর রহমান জিহাদীর শুক্রবার দুপুরে হার্ড এ্যাটাক হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি স্থানীয় যে চিকিৎসককে দেখিয়ে ছিলেন তিনি তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তখন খুলনা যেতে বলেন। কিন্তু তিনি তখন খুলনা না গিয়ে রাতে আবারো যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। এ সময় কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেন। এ প্রস্তুতিকালেই হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এতে হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসকদের কোন অবহেলা ও গাফিলতি নেই।

খলিলুর রহমান জিহাদীর বাড়ি ঝালকাঠীর রাজাপুর। রাতে হাসপাতালে মৃত্যুর পর শনিবার সকালে টিএফারুক স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তার প্রথম জানাযা নামাজ শেষে গ্রামের বাড়ি রাজাপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানেই তার দাফন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তার পরিবার ও সহকর্মীরা। শুক্রবার রাতে হাসপাতালে তার মৃত্যুর খবর পেয়ে তার সহকর্মী চালনা বন্দর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা রুহুল আমিন, কেন্দ্রীয় বাজার জামে মসজিদের পেশ ঈমাম ও খতিব মাওলানা তৈয়বুর রহমান, টিএফারুক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাইদসহ বিশিষ্টজনের হাসপাতালে ছুটে যান। তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন মোংলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এইচ এম দুলালসহ বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *