অস্তিত্ব সংকটে গফরগাঁওয়ের শীতল পাটির শিল্পীরা

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) থেকে আতাউর রহমান মিন্টু: ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের শীতল পাটি শিল্পীদের মাঝে নেমে এসেছে দুর্দিন। আর্থিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, আধুনিক প্রযুক্তির দাপট, ক্রেতা স্বল্পতার কারণে গফরগাঁওয়ে শীতল পাটি শিল্পীরা অস্তিত্ব সংকটে। এ অঞ্চলের পাটি শিল্পীরা সাত পুরুষের পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। মহাজনদের ঋণের ফাঁদে পড়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে দেশান্তরি হয়েছেন অনেকেই। এরপরও কিছু মানুষ নাড়ির টানে ধরে রেখেছেন এই পেশাকে। চাকুয়া ও কুরচাই গ্রামে গেলে দেখা মিলবে তাদের। উপজেলার নিগুয়ারী ইউনিয়নের দুইটি গ্রাম কুরচাই ও চাকুয়া। ওই দুটি গ্রামের শতাধিক পরিবারের জীবিকা শীতল পাটি বোনা।

Gafargaon pic-4.minto.20.06.2015
শীতল পাটি বুননের কাজ করেছে চাকুয়া গ্রামের পাটি শিল্পীরা

শেকড় আকঁড়ে ধরে: একসময় উপজেলার নিগুয়ারী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে শীতল পাটি বোনা হতো। চাকুয়া ও কুরচাই গ্রামের হিন্দু ধর্মালম্বীদের প্রায় ৫শতাধিক পরিবার শীতল পাটি বোনার কাজে জড়িত ছিল। বর্তমানে এই দু’টি গ্রামের শতাধিক পরিবার বেত চাষ ও পাটি বুনেই সংসার চালান। পুরুষের পাশাপাশি এই সব পাটি শিল্পী পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যরাও পাটি বোনার কাজ করে থাকেন। যাদের জমি নেই তারা অন্যের জমিতে বেতের (মোর্তাক) বর্গা চাষ করে থাকেন। গ্রাম দুটির প্রায় ১০ একর জমিতে বেতের চাষ হয়।

বোনা হয় যেভাবে: মোর্তাক গাছ থেকে পাটি তৈরি করা হয়। বাঁশের কঞ্চির মত দেখতে এই গাছ পাটি শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাই চাষ করে থাকে। বাজারে কিনতেও পাওয়া যায় এই মোর্তাক গাছ। এক আটি মোর্তাকের দাম পড়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। বাড়িতে এনে কাঁচা গাছ দা দিয়ে পাতলা করে ফালি করতে হয়। একেকটি গাছ তিন ফালি করে কাঁটা হয়। ফালির প্রথম অংশ ‘নাল’ বলে পরিচিত। এটি দিয়ে পাটি বোনা হয়। শেষ অংশ ‘বুকা’ বলে পরিচিত। ‘বুকা’ দিয়ে পাটি বানানো ছাড়াও এটি জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। নাল পাতলা করে কেটে গরম পানিতে সিদ্ধ করতে হয়। তারপর এতে কখনও রং লাগিয়ে কখনও বা রং ছাড়া পাটি বোনা হয়। একেকটি পাটি বোনতে একজন কারিগরের দুই-তিন দিন সময় লাগে।

Gafargaon pic-3.minto.20.06.2015
মোর্তাক গাছ থেকে শীতল পাটির নাল তৈরিতে ব্যস্ত চাকুয়া গ্রামের পাটি শিল্পীরা

শীতল পাটি গ্রামে একদিন: উপজেলা সদর থেকে ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে শীতলক্ষা (স্থানীয় নাম কালিবানার) নদীর তীরে পাশাপাশি দু’টি গ্রাম চাকুয়া ও কুরচাই। গাছ-গাছালি ঘেরা ছায়া সুশীতল গ্রামগুলিতে গিয়ে দেখা যায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ থেকে ৮-১০ বছরের শিশুরা পাটি বুননের নিপুন কাজে ব্যস্ত। অনেকেই ক্ষেত থেকে ‘মোর্তাক’ গাছ কাটছেন। মোর্তাক গাছ কেঁটে পানিতে ভিজাচ্ছেন। গাছ থেকে ‘নাল’ তৈরি করছেন। ‘নাল’ এ রং করছেন।

চাকুয়া গ্রামের পাটি শিল্পী বিদু চন্দ্র দে (৩৫) বলেন, তিনি ও তার স্ত্রী মিলে পাটি বুনে ৪ ছেলে মেয়েসহ ৬ জনের সংসার চালান। কলেজ ছাত্রী চাকুয়া গ্রামের যমুনা রানী দে (২০) জানায়, পাটি বুনেই সে লেখাপড়ার খরচ চালায়। একই গ্রামের পাটি শিল্পী গোপাল চন্দ্র দে (৫৩) বলেন, একবার বীজ রোপন করলে এই মোর্তাক গাছ বড় হওয়ার পর ৬০ বছর পর্যন্ত বেত কাঁটা যায়। সাধারণত বীজ রোপন করার পর চার বছর পর থেকে বেত কাঁটা শুরু হয়। পাটি শিল্পী উত্তম চন্দ্র দে (২৮) জানান, সাধারণত তারা চার ধরনের পাটি তৈরি করেন। পিঠা পাটি, ডালা পাটি, শীতল পাটি ও বোকাই পাটি। একেকটি পাটি বিক্রি করে ৩০ থেকে ৫০ টাকা লাভ করতে পারেন। একটি চার হাত বাই পাঁচ হাত মাপের শীতল পাটির দাম ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত হয়। ডালা পাটির দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। চাকুয়া গ্রামের মমতা রানী দে (৩১) জানায়, অন্য একটি পাটি তৈরি করতে একদিন সময় লাগলেও একটি শীতল পাটি বানাতে তিন দিন সময় লাগে। উন্নতমানের নাল ছাড়া শীতল পাটি হয় না। পাটি শিল্পী মনরেখা দে (৪৩) বলেন, বাপ দাদার আমল থেকে আমরা পাটি বুনছি। আগে ব্যবসা ভালো হতো। বর্তমানে প্লাষ্টিকের মাদুর ও পাটির জন্য আমাদের পাটির চাহিদা কমে গেছে। কম মূল্যের প্লাষ্টিকের পাটির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে আমরা আমাদের তৈরি পাটির মূল্য বাড়াতে পারছি না। পাটি তৈরির কাজে ব্যবহৃত রংসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে সেভাবে পাটির দাম বাড়ছে না। এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

কুরচাই গ্রামের লনি রানী দে (৭০) বলেন, বিয়ের পর থেকে স্বামীর বাড়িতে প্রায় ৫৩ বছর ধরে পাটি বোনার কাজ করছি। পূর্ব পুরুষের এই পেশার প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মানোর ফলে এই পেশা ছাড়তে পারেননি লনি রানীর পরিবার। কিন্তু ছেড়ে দিয়েছেন নিজের জমি সম্পদসহ সবকিছু। তিনি জানান, নিজের জমি না থাকায় এখন মহাজনের সঙ্গে চুক্তিতে পাটি বুনে থাকেন। একটি শীতল পাটি বুনে মজুরি পাওয়া যায় ১৮০ টাকা। পরিবারের অন্য সদস্যরাও এই পেশায় জড়িত থেকে সামান্য যে মজুরি পান তা দিয়ে অতি কষ্টে সংসার চালান। লনি রানী দে’র মতো পাটি শিল্পীদের অনেকে মায়ায় পরে এই পেশা আঁকড়ে ধরে মহাজনের ঋণের চক্রে পড়ে সাত পুরুষের ভিটেমাটি বিক্রি করে দেশান্তরি হয়েছেন।

এই অঞ্চলের পাটি শিল্পীরা জানায়, পেশায় টিকতে না পেরে ভবেশ চন্দ্র সরকার, জীবন চন্দ্র দে, মনিন্দ্র চন্দ্র দে, প্রমোদ মিত্র, ক্ষিতিশ চন্দ্র দে-সহ এ অঞ্চলের প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার ভিটেবাড়ি, সহায়সম্পদ বিক্রি করে দেশান্তরি হয়েছে। পাটি শিল্পীদের এই দুরবস্থা থেকে মুক্ত করতে, সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতার আশায় এই দুই গ্রামের পাটি শিল্পীরা ২০০৭ সালে লোকনাথ শীতল পাটি উৎপাদনকারী শ্রমজীবি সমবায় সমিতি লিঃ নামে সমিতি গঠন করে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দিয়েও কোন সাহায্য সহযোগিতা না পেয়ে এই সমিতির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। সমিতির সভাপতি নিখিল চন্দ্র দে (৭৩) বলেন, এক সময় চাকুয়া ও কুরচাই গ্রামের  ৫ শতাধিক পরিবার এই শিল্পে জড়িত  ছিল। এর মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার এই পেশায় টিকতে না পেরে এক সময় নিঃস্ব হয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে দেশান্তরি হয়েছেন। আরও কমপক্ষে শতাধিক পরিবার জীবন জীবিকার তাগিদে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

বেত কেঁটে নাল তৈরিতে ব্যস্ত কুরচাই গ্রামের ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মনোরঞ্জন চন্দ্র দে আক্ষেপ করে বলেন, আমার তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে ও তার পরিবারের লোকজন এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। পাটি শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উজ্জল চন্দ্র দে বলেন, যারা এখন এ পেশায় জড়িত রয়েছেন, তাদের টিকিয়ে রাখতে পাটি শিল্পীদের  সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দিতে হবে। তাহলে তাদের পুঁজি বৃদ্ধি পাবে এবং বেশি পরিমান পাটি তৈরি করে মুনাফা অর্জন করতে পারবে।

এদিকে কুরচাই ও চাকুয়া গ্রামের পাটি শিল্পীরা  গফরগাঁওসহ পাশের উপজেলাগুলোতে ময়াল (ফেরি) করে পাটি বিক্রি করে থাকে। এছাড়াও স্থানীয় পাইকার ও মহাজনরা পাটি শিল্পীদের বাড়ি বাড়ি গিয়েও তাদের কাছ থেকে পাটি ক্রয় করে থাকে। প্রান্তিক ও গরীব পাটি শিল্পীদের স্থানীয় মহাজনরা আগাম ঋণ দিয়ে থাকে। স্থানীয় মহাজনদের ঋণ পরিশোধ করতে অনেকে বাধ্য হয়েই কমদামে পাটি বিক্রি করে। এছাড়াও মহাজনরা গরীব মোর্তাক চাষিদের  চড়া সুদে ঋণ দিয়ে কমদামে পাটি ক্রয় করছে। ফলে ফায়দা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এতে করে পাটি শিল্পী ও মোর্তাক চাষিরা আরও সর্বস্বান্ত হচ্ছে। পাটি শিল্পী অবলা রানী দে (৬৩) বলেন, আমাদের কাছ থেকে পাইকাররা যে পাটি ৫০০ টাকায় কিনে নেয় তা বাজারে হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়। চাকুয়া গ্রামের পাইকারী ক্রেতা হরিদাস (৬৫), কুরচাই গ্রামের রঞ্জিত (৪০) বলেন, চাকুয়া ও কুরচাই গ্রাম থেকে শীতল পাটিসহ অন্যান্য পাটি কিনে এনে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন। এসব গ্রামের শীতল পাটি অনেক সময় বিদেশেও রফতানি হয়। তবে চাহিদার তুলনায় শীতল পাটির সরবরাহ কম। স্থানীয় ইউপি সদস্য আরব আলী মৃধা স্বীকার করে বলেন, বিগত সময়গুলোতে এই দুই গ্রাম থেকে প্রায় তিন শতাধিক পাটি শিল্পী পরিবার দেশান্তরি হয়েছেন। নিগুয়ারী ইউপি চেয়ারম্যার শাহবুদ্দিন খান বলেন, চাকুয়া ও কুরচাই গ্রামের পাটি শিল্পীরা তাদের সাত পুরুষ ধরে পাটি বানানোর পেশায় জড়িত। প্রতিকূলতার মধ্যেও পূর্ব পুরুষের পেশা এভাবে ধরে রাখার ঘটনা বিরল।