মন্ত্রীর পরামর্শ উপেক্ষা করে গণছাঁটাই, ঈশ্বরদীর ডাল গবেষণা কেন্দ্রের শ্রমিকদের প্রতিবাদ

স্বপন কুমার কুন্ডু, ঈশ্বরদী (পাবনা): কুষ্টিয়ার ফরিদা খাতুন ২০ বছর ধরে মাস্টার রোলে ডাল গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করছেন। হঠাৎ করেই গত ১ আগস্ট তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। স্বামী পরিত্যক্তা ফরিদার একমাত্র মেয়ে পাবনা এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সম্মান শেষ বর্ষের ছাত্রী। ফরিদা বললেন, বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি, চাকরি না থাকলে এখন কীভাবে চলবে।

অরনকোলা গ্রামের বিধবা মনোয়ারা অনিয়মিত নারী শ্রমিক হিসেবে আট বছর ধরে মাস্টার রোলে চাকরি করছেন। তিন বছর পর চাকরি স্থায়ী হবে এজন্য ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকাও দিয়েছেন। ছাঁটাই হওয়ায় তিনি তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন চোখে মহাবিপদে পড়েছেন।

সুলতান গিয়াস ও আব্দুল আলীম ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করলেও চাকরি স্থায়ী হয়নি। শনিবার ছুটির দিনে নোটিশ বোর্ডে নোটিশ টাঙ্গিয়ে পরিচালক শোয়েব হাসান এভাবে পুরুষ ও নারী মিলিয়ে মোট ৮৬ জন মৌসুমী, অনিয়মিতম ও অফিস মাস্টার রোলের শ্রমিকদেরকে  এভাবে  গণছাঁটাই করেছেন। এমনকি মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনকে ছাটাই করে মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছেন।

ishwardi pulse research institute

গণছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকদের বিক্ষোভ।

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে ঈশ্বরদী ডাল গবেষণা কেন্দ্রে শ্রমিকরা লাঠি-সোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ৪-৫ দিন আগে নোটিশ দেয়ার নিয়ম থাকলেও নোটিশ না দিয়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে।

শ্রমিকরা জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় তিন বছর মাস্টার রোলে চাকরি করলে তাদের স্থায়ীকরণের বিধান রয়েছে। অথচ অনেকেই ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করলেও চাকরি স্থায়ী করা তো দূরের কথা, ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাইয়ের আগে শ্রমিক নেতাদের সাথে কোনো আলোচনাও করা হয়নি বলে জানান তারা।

শ্রমিক সমিতির সভাপতি সকিম উদ্দিন জানান, ডাল গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালক রফিকুল ইসলাম মন্ডলের স্বাক্ষরে এসব অনিয়মিত ও মাস্টার রোলে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মহাপরিচালক পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এরা কাজ করবে বলে নিয়োগপত্রে উল্লেখ থাকলেও তারই অধস্তন কর্মকর্তা অন্যায়ভাবে এই ৮৬ জনকে ছাঁটাই করেছে। এই নিয়ে গবেষণা কেন্দ্রের অভ্যন্তরে অচলবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এসময় অরনকোলা গ্রামের তারেক বিশ্বাস, চরমিরকামারি গ্রামের আইয়ুব আলী, সিরাজগঞ্জের রুহুল আমিন, চরমিরকামারী গ্রামের রফিকুল ইসলাম, বেদৃনদিয়ার আলাউদ্দিনসহ প্রায় অধিকাংশ শ্রমিক জানান, চাকরি নেয়ার সময় থেকে তিন বছর পার হলে চাকরি স্থায়ী হবে এই কথা শুনে ও বিশ্বাস করে তাদের প্রত্যেকেই পঞ্চাশ হাজার টাকা থেকে আড়াই লাখ পর্যন্ত টাকা হেড অফিসের প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে স্থানীয় ডাল গবেষণা কেন্দ্রের পূর্ববর্তী পরিচালক ও বর্তমান পরিচালক শোয়েব হাসানও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে শ্রমিকরা জানান।

শ্রমিকরা আরো বলেন, স্থানীয় ফান্ডে টাকা নেই এমন খোঁড়া অজুহাতে ইতোপূর্বেও পরিচালক শোয়েব হাসান শ্রমিক ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ছাঁটাই না করার জন্য বলেন। তিনি মন্ত্রীর আদেশ অমান্য করে শ্রমিক ছাঁটাই করে ঈশ্বরদী ত্যাগ করেছেন।

এ ব্যাপরে বৃহস্পতিবার পরিচালক শোয়েব হাসানের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ছাঁটাই কথাটি ঠিক নয়। শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়নি। ফান্ডে টাকা না থাকায় সাময়িকভাবে তাদের কাজ বন্ধ করা হয়েছে। টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থার জন্যই আমি ঢাকায় অবস্থান করছি। টাকা পেলে কাল থেকেই তারা কাজ করতে পারবে বলে তিনি জানান। তিনি আরো জানান, স্বাভাবিকভাবে এসময়টা মাঠে কোনো ফসল থাকে না এবং কাজও থাকে না বলে ডিজি অফিসের কোনো বরাদ্দ নেই। চাকরি স্থায়ীকরণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই কেন্দ্রে দুটি কোটায় ৮৫টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। এখানে কোনো পদ খালি নেই। কেউ অবসরে গেলে তখন স্থায়ী করা যাবে বলে তিনি জানান।

ফান্ড প্রসংগে শ্রমিকরা জানান, এই কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যক জমি পতিত পড়ে আছে। ১৯৮১ সালে এখানে ১১৬জন শ্রমিক কর্মরত ছিল। সেসময় বছরে ১/২ বার বছরে ফসল হতো। এখন  ১৫০ জন শ্রমিক কর্মরত। বছরে তিনটি ফসল হয়। প্রতিষ্ঠানের পতিত জমিতে ফসল ছাড়াও সবজি ও ফলের বাগান, বিশাল জলাশয়ে নিয়মিত মাছ চাষ করলে ফান্ড সংকট তো হবেই না বরং উদ্বৃত্ত থাকবে বলে তারা জানান।