কলাপাড়ায় ১ বছরে থেমে গেছে ৮ম শ্রেণির ৩০৩ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন

????????????????????????????????????

মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া(পটুয়াখালী): পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বাল্যবিয়ে, বখাটেদের উপদ্রপ, দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের ঝরে পড়া হঠাৎ বেড়ে গেছে। সেই সাথে শিক্ষকদের টাকার বিনিময়ে কোচিং ক্লাস বাধ্যতামূলক করা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগে আন্তরিকতার অভাবে সমুদ্র উপকূলীয় এ উপজেলায় সরকারের সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক ব্যহত হচ্ছে। এ বছর অনুষ্ঠিত জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় কলাপাড়ার ১৬ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১২ টি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বিশ্লেষণ ও সরেজমিন অনুসন্ধান করে এমন চিত্রই পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এ বছর উপজেলার ২৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৫৭৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০৩ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতেই ঝরে পড়েছে। যার গড় হার ১১ দশমিক ৭৭ ভাগ। ১৬ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ১ হাজার ৮১৭ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। এরমধ্যে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ হাজার ৬৭১ জন। এক বছরে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে গেছে ১৪৬ জন। যার মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যাই বেশি। তবে মাদ্রাসা স্তরে ঝরে পড়ার হার ২৬ দশমিক ১২ ভাগ।

উপজেলার আশ্রাফ একাডেমি থেকে ১৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে ১২৬ জন। বেতমোর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় ৬৯ জন শিক্ষার্থী রেজিষ্ট্রেশন করলেও পরীক্ষা দিয়েছে ৫১ জন। মহিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৯০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত পাওয়া গেছে ২৬৫ জন। পাখিমারা প্রফুল্ল মনো ভৌমিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ৪ জন, খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৪২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১২৮ জন। লোন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫৬ জন। অনুপস্থিত ১০ জন।

রজপাড়া দ্বীন-ই-এলাহি মাদারাসায় অষ্টম শ্রেণিতে ৮৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৭৬ জন। মোয়াজ্জেমপুর মাদ্রাসায় ৬৬ জনের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫২ জন। মুসল্লিয়াবাদ মাদ্রাসায় ১০২ জনের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮৬ জন। ইউসুফপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় ৬১ জনে ৪৭ জন। আক্কেলপুর মাদ্রাসায় ৬০ জনে ৩৭ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উপজেলার ১২টি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭৫৮ জন। কিন্তু জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৬০১ জন।  ঝরে পরেছে ১৫৭ জন।

ফরিদগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতেমা, কুলসুম, রিতা ও বিউটি এ বছর জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য রেজিষ্ট্রেশন করলেও বাল্যবিয়ের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়। আর্থিক সমস্যার কারণে এ বিদ্যালয়ের ছাত্র খায়রুল অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর পরীক্ষার জন্য রেজিষ্ট্রেশন করতে পারেনি। বর্তমানে সে ঢাকায় শ্রমবিক্রির কাজ করে। এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানালেন শুধু বাল্যবিয়ের কারণে তার বিদ্যালয়ের চার ছাত্রীর শিক্ষাজীবন শেষ।

বখাটেদের উপদ্রবের কারণে শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়েছে পাখিমারা প্রফুল মনো ভৌমিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্না হাওলাদারের। সন্মান বাঁচাতে আট মাস আগে তার বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে পরিবার।
মুসল্লীয়াবাদ মাদ্রাসার এক শিক্ষক  জানান, গ্রামবাসীর সহায়তার মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মাজেদা বেগমের বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে পারলেও তার শিক্ষাজীবন রক্ষা করতে পারেননি। পরিবারের অসচেতনতায় তার এখন লেখাপড়া বন্ধ। ধানখালী মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার জানান, তার মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছয় ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। কুয়াকাটা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার জানান, তার অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আজমইন দারিদ্র্যের কারণে পরীক্ষা দিচ্ছে না।

একাধিক অভিভাবক জানান, লেখাপড়া এখন বড়লোকের জন্য। স্কুলে কোচিং না করলে শিক্ষকরা পরীক্ষায় মার্কস দেয় না। প্রাইভেট না পড়লে গরিব শিক্ষার্থীদের প্রতি নজর দেয় না। তাই আর্থিক সংকটে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।

একাধিক শিক্ষক জানান, শহরের চেয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় এ ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। তবে এর কারণ হিসেবে গ্রামীণ জনপদে মেয়েদের স্কুৃল-মাদ্রাসায় যেতে নানা প্রতিবন্ধকতা ও বখাটেদের হয়রানী সহ্য করতে হওয়ায় অভিভাবকরা স্কুলের পাঠ চুকিয়ে মেয়ে বিয়ে দিয়ে পরিবারের সন্মান রক্ষা করছে। তারা বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে অবহিত থাকলেও মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

খেপুপাড়া মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো.শাহাদাৎ হোসেন বিশ^াস সাংবাদিকদের বলেন, বখাটেপনার শিকার অভিভাবকরাই মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিচ্ছে । ছাত্রীদের স্কুলে আসা-যাওয়ায় সন্ত্রাসীর উত্যক্তের কারণে দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে। তাই বাল্যবিয়ে রোধের মতো বখাটেপনা রোধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

কলাপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী রহুল আমিন জানান, বাল্যবিয়ের চাইতে দরিদ্রতা বেশি সমস্যা এখানে। তারা বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে স্কুলে সচেতনতামূলক কর্মকা- চালাচ্ছেন। তবে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে সবার আগে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম সাদিকুর রহমান জানান, বাল্যবিয়ে রোধে সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। বাল্যবিয়ে রোধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে একাধিক অভিযুক্তকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং বিয়ের রেজিস্ট্রারদের নিয়ে এ বিষয় আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

Be the first to comment on "কলাপাড়ায় ১ বছরে থেমে গেছে ৮ম শ্রেণির ৩০৩ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.