স্মরণ: কামরুল হাসান মঞ্জু

মোবারক হোসেন

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০। কামরুল হাসান মঞ্জু’র প্রথম প্রয়াণ দিবস। রাত আটটা থেকে প্রায় জনাবিশেক সাংবাদিক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ভারচুয়াল আলোচনায় অংশ নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন প্রয়াত কামরুল হাসান মঞ্জুকে।কেউ বললেন, কামরুল হাসান মঞ্জু যিনি গণমানুষের কণ্ঠস্বর, তিনি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েই বহু বছর বেঁচে থাকবেন। কেউ বললেন, তিনি যে ধারার সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন সেখানে তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ।কেউ বলেছেন, স্থানীয় সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা, অধিকারহারা ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তিনি বহুকাল গণমাধ্যমে বিচরণ করবেন।দৈহিকভাবে কামরুল হাসান মঞ্জুর মৃত্যু হলেও তাঁর চিন্তা-চেতনা-ভাবনা আমাদের সাংবাদিকতাকে যুগে যুগে ভাবিয়ে তুলবে। অতএব তাঁর কর্ম ও চিন্তাকে মুছে ফেলা যাবে না কখনোই। বার বার স্মরণে আসবেন তিনি তৃণমূল মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে।
কামরুল হাসান মঞ্জুর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল দেড় যুগ। ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সাল। একজন পরিণত মানুষের সক্রিয় কর্মকালের বয়সের যোগফল বলা যায়। ব্যক্তিগত কিছু দ্বন্দ্ব-অমিল থাকা সত্বেও শুধুমাত্র প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে চিন্তা ও আদর্শের ক্ষেত্র অবিচ্ছেদ্য হওয়ায় যৌবনের সবটা সময় তাঁর সাথে ব্যয় করেছি। পদ-পদবি-অর্থ-বিত্তকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছি মানুষের সমস্যা বয়ান করতে করতে। প্রান্তিক মানুষের অধিকারের বয়ান করতে করতে কখন যে যৌবন থেকে ছিটকে পড়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষে পরিণত হলাম বুঝতেই পারিনি। এসবই যেন হয়েছিল আমাদের প্রথম নেতা কামরুল হাসান মঞ্জুর এক অদৃশ্য মোহ ও যাদুর টানে।
বিক্ষুব্ধ ঢেউ উপেক্ষা করে ওসমান মাঝির ট্রলারে নোয়াখালীর চরবাটা থেকে মেঘনা পার হয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়ায় চলে গেছি বিচ্ছিন্ন মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প শোনার জন্যে। কামরুল হাসান মঞ্জু একবার বলেছিলেন কেন তিনি ম্যাস-লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) প্রতিষ্ঠা করলেন। ১৯৮৮ সালে নোয়াখালীর উড়ির চরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়। ঝড়ের পরে তিনি একটি এনজিওর ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন সেখানে। মানুষের দুর্দশা, অভাব, কঙ্কালসার দেহ দেখে তিনি বিস্মিত ও মর্মাহত হয়ে পড়েন। সমাজের এসব নিগৃহীত, বঞ্চিত, নিচুতলার মানুষের কথা ও ছবি আমাদের প্রচলিত গণমাধ্যমে স্থান না পাওয়ায় তিনি দারুণভাবে ব্যথিত হন। এখান থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন অধিকারহারা-বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বরকে তিনি গণমাধ্যমে তুলে ধরবেন। দেশের প্রচলিত গণমাধ্যম যেখানে এইসব প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে অথবা তুলে ধরতে চায় না—তিনি তখন ভাবলেন বিকল্প গণমাধ্যমের কথা বিকল্প পথে। তাঁর প্রয়াণের এক বছর পরে এসে কেবলই মনে হচ্ছে যাদের জন্য তিনি যা করেছেন তা কী তারা মনে রাখবে?
কামরুল হাসান মঞ্জুকে স্মরণে রাখবে কী নোয়াখালীর দুর্গাপুর ইউনিয়নের আজকের প্রজন্ম? এই প্রজন্ম কী জানে চল্লিশ বছর ধরে তাদের পিতা, পিতার পিতারা নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল তথাকথিত ধর্মীয় বিধি-নিষিধের দোহাই দিয়ে? তারা কী স্মরণ রাখবে কোথা থেকে এক কামরুল হাসান মঞ্জু এসে নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় কী এক ন্যায্য দরকষাকষি করেছিলেন? নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, গোপালগঞ্জ, কুড়িগ্রামসহ দেশের কয়েকটি জেলার অন্তত নয়টি ইউনিয়নে নারীরা দীর্ঘদিন তাদের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। কামরুল হাসানের বলিষ্ঠ তৎপরতায় সবগুলো ইউনিয়নে নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। এখন সব নারীরা ভোট দেন, ভোটে অংশ নেন।
 
 

কামরুল হাসান মঞ্জু (১৬ জানুয়ারি ১৯৫৬-২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯)

আমাদের প্রচলিত গণমাধ্যমের বিপরীতে তাঁর উদ্ভাবিত গণমাধ্যমকেন্দ্রিক যে ভাবনাগুলোর কথা তিনি সবসময় বলতেন তার যদি একটা সারাংশ টানা যায় তা হলে হয়তো অনেকের কাছেই স্পষ্ট হবে তিনি কী কী করতে চেয়েছিলেন। কিছু শব্দ ও বাক্য তিনি প্রায়ই বলতেন চেতনে-অবচেতনে। সবগুলো শব্দ ও বাক্য বিশেষণে বিশেষায়িত এবং মানুষের সাথে যুক্ত। ওপর তলা-নিচুতলার মানুষ, বিচ্ছিন্ন মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, তৃণমূলস্তরের মানুষ, অধিকারহারা মানুষ, বঞ্চিত মানুষ, কণ্ঠহীন মানুষ, তথ্য শূন্যতায় থাকা মানুষ, তথ্যহীনতায় ভোগা মানুষ, তথ্য অধিকার, শহর-গ্রাম বৈষম্য, ধনীদের গণমাধ্যম, স্থানীয় সংবাদপত্রকে শক্তিশালী করা, মানুষকে তথ্যায়িত করা, বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর ইত্যাদি ইত্যাদি। কামরুল হাসান মঞ্জু আমৃত্যু এসব শব্দের পেছনে সময় ব্যয় করেছেন, লিখেছেন সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়, শব্দগুলো বলেছেন সেমিনারের বক্তায়, কবিতা ও গানে চর্চায়।
গাঙপারের জেলেরা কী তাকে স্মরণে রাখবে নদীতে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকার বন্ধ থাকার কারণে খাদ্য ও দৈনন্দিন জীবনের সমস্য নিয়ে তিনি জেলেদর ওপর এক অনবদ্য গবেষণা কার্য়ক্রম সম্পন্ন করেছিলেন? কীটনাশক সংকট, সমন্বিত বালাই দমন, সময়মত কৃষি বীজ সংগ্রহ করার মতো কৃষিবান্ধব তথ্য সরবরাহের জন্য তিনি যে জনতথ্য ঘর এর প্রবর্তক ছিলেন, কোনো কৃষক তা মনে রাখবে কী?
বরগুনার আজকের প্রজন্ম জানে কী সেখানকার নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনসংগ্রাম, গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত জাল-জালোয়ার জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস দ্রুত সময়ে স্থানীয় ভাষায় প্রচার করার করার জন্যে দেশের প্রথম কমিউনিটি রেডিও স্থাপন করেছিলেন একজন কামরুল হাসান মঞ্জু? রাষ্ট্রের কর্তাদের সাথে কত দেন-দরবারের পর সম্প্রচারে যাওয়া বরগুনার লোকবেতার কেমন করে ‘মোগো রেডিও মোগো কথা কয়’ সেই ইতিহাস জানে তারা?
আত্মমুখী, প্রচারমুখী মানুষেরা হয়তো আপনাকে স্মরণে রাখবে না। মনে না রাখারই কথা। মৃত্যুর পরে তো কেউ কারো কাজে আসে না। কেউ হয়তো জানার চেষ্টাও করেনি বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বরকে জাগিয়ে তুলতে আপনি নিজেই অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু আমরা ধারণা করতে পারছি, আপনার অন্তিম মুহূর্তেও হয়তো কোনো একান্ত কাঙ্ক্ষিত দরদী হাত আপনাকে স্পর্শ করেনি।
আমরা যারা আপনার দরদী চিন্তাগুলো আপনার জীবদ্দশায় পালন করেছি, মনে করেছি গুরুত্ব দিয়ে, মেনে নিয়েছি হৃদয় দিয়ে সেই তারাই আপনার মরণোত্তরকালেও আপনার চিন্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে নিবেদিত থাকব আদর্শিক দায়িত্ব নিয়েই।
আপনার কবর-জগত মঙ্গলময় হোক। শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকুন নেতা।

কামরুল হাসান মঞ্জু, আবৃ্ত্তিশিল্পী ও গণমাধ্যম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ম্যাস-লাইন মিডিয়া সেন্টারের (এমএমসি) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক

লেখক সাবেক কর্মকর্তা, এমএমসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.