কমলনগরে ভুয়া ডায়াগনস্টিক রিপোর্টে চরম ভোগান্তিতে রোগীরা

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) থেকে মো. ওয়াজি উল্যাহ জুয়েল: লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা উপকূল ল্যাব এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভুয়া রিপোর্টের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনও লাইসেন্স ছাড়াই কাজ করছে এই ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

নদীভাঙ্গন কবলিত এলাকার অসহায় দরিদ্র লোকজন চিকিৎসার জন্য কমলনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসলে ডাক্তাররা পরীক্ষার জন্য উপকূল ল্যাবে পাঠান। ডাক্তারদের সাথে ল্যাব মালিকদের যোগসাজশে প্রতারণার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হয়রানির শিকার হচ্ছে অসহায়, দরিদ্র রোগীরা।

রোগীদের এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে যে, ভুয়া পরীক্ষার নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন উপকূল ল্যাব এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডা. শায়লা আলম।

ভুক্তভোগীরা জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত রোগীদের ভীড় থাকা সত্বেও ডা. শায়লা আলম অধিকাংশ সময়ই উপকূল ল্যাবে গিয়ে রোগী দেখেন। তারা আরও জানান, শায়লা আলম একজন মেডিকেল অফিসার, কিন্তু তার ভিজিটিং কার্ড ও প্যাডে লেখেন একজন গাইনি অভিজ্ঞ।

ডা. শায়লা আলমের কর্মস্থল করুণানগরে অবস্থিত হাজিরহাট ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্র। সার্বক্ষণিক তার সেখানে অবস্থান করার কথা থাকলেও তিনি নিয়মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (করইতলা) অবস্থান করেন। হাজিরহাট ইউনিয়নের একাধিক ব্যক্তি জানান, ডা. শায়লা আলমকে আমার কখনই দেখি নাই।

গত ৭ মে আকবর হোসেন নামে এক রোগীকে কমলনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডা. শায়লা আলমের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জানান, তার জন্ডিস হয়েছে এবং রক্তের সিরাম বিলরুবিন পরীক্ষা উপকূল ল্যাবে করান। সেখানে পরীক্ষায় দেখা যায় তার রক্তে সিরাম বিলরুবিন এর পরিমাণ ১৫.৩৮।

এরপর তাকে লক্ষ্মীপুর মিলিনিয়াম হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পরে ঐ তারিখেই লক্ষ্মীপুর সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষায় দেখা যায় তার সিরাম বিলরুবিন এর পরিমাণ ৫.০৬।

এ ব্যাপারে আকবরের পিতা হেলাল উদ্দিন জানান, আমার ছেলে অসুস্থ হলে কমলনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডা. শায়লা আলমের কাছে নেই। তিনি দেখে বলেন, জন্ডিস হয়েছে, রক্ত পরীক্ষা দিয়েছি উপকূল ল্যাবে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনেন। উপকূল ল্যাবে প্রায় ৩ঘন্টা অপেক্ষার পর রক্তের রিপোর্ট দিলে আমি ডা. শায়লাকে রিপোর্ট দেখাই। তখন তিনি রিপোর্ট দেখে আমাকে লক্ষ্মীপুর মিলিনিয়াম হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আমি নিরুপায় হয়ে তাকে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের লেকচারার ডা. মোহাম্মদ নাছিরুজ্জামানের কাছে গেলে তিনি আকবরকে পুনরায় সিরাম বিলরুবিন পরীক্ষা করার কথা বলেন। আমি লক্ষ্মীপুর সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে পুনরায় ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি জানান যে, নরমাল। সেবা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায় সিরাম বিলরুবিন এর পরিমান রয়েছে ৫.০৬ । তিনি আরও জানান, আমি খুব ভয় পেয়ে গেছি এভাবে তারা রোগীদের সাথে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

উপকূল ল্যাবের এমডি মাহফুজুর রহমানের কাছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনও লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন লাইসেন্স এখনও পাই নাই। আপনার প্রতিষ্ঠানে আকবরের সিরাম বিলরুবিন রিপোর্ট ১৫.৩৮ অথচ লক্ষ্মীপুর সেবা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে তার সিরাম বিলরুবিন রিপোর্ট ৫.০৬, এক্ষেত্রে কি বলবেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের রিপোর্ট সত্য, আমি রোগীর রক্ত অন্য ল্যাবেও পরীক্ষা করিয়েছি রিপোর্ট একই। কীভাবে রক্তের পরীক্ষা করিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি ল্যাবে এসে রোগীর থেকে রক্ত নিয়ে লক্ষ্মীপুরে গিয়ে অন্য ল্যাবে রক্ত পরীক্ষা করাই। রক্তের কনিকার ধারণ ক্ষমতা কতক্ষণ থাকে জানতে চাইলে তিনি জানান, রক্ত নেওয়ার ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত পরীক্ষার ধারণ ক্ষমতা থাকে। আকরামের বাবা লক্ষ্মীপুর থেকে রিপোর্ট নিয়ে আপনার ল্যাবে গেলে তাকে ম্যানেজ করার জন্য মাকসুদের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা দিতে চেয়েছেন কেন জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন।

এ ব্যাপারে ডা. শায়লা আলমের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, উপকূল ল্যাবের রিপোর্ট সত্য। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে আপনি উপকূল ল্যাবে যান এবং রোগী দেখেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভাল বাথরুম না থাকায় সেখানে যেতে হয়। আপনিতো মেডিকেল অফিসার, কিন্তু কার্ড ও প্যাডে দেখা যায় গাইনি অভিজ্ঞ লিখেছেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোনও উত্তর দেন নাই।

কমলনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএসও নিজাম উদ্দিন জানান, ডা. শায়ল আলমের ডিউটিকালীন সময়ে উপকূল ল্যাবে রোগী দেখার বিষয়টি তদন্ত করে দেখব।

লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন গোলাম ফারুক ভুঁইয়া জানান, যদি কোনও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের লাইসেন্স না থাকে তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।