জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর জোরালো করতে নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

ঢাকা, ১৬ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নে গণমাধ্যমে আরও নিয়মিত, গভীর এবং প্রতিনিধিত্বমূলক কভারেজ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মধ্যে আরও কাঠামোগত ও টেকসই সহযোগিতা প্রয়োজন।

গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সমষ্টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে ক্রিশ্চিয়ান এইড বাস্তবায়িত “এক্সপ্যান্ডিং সিভিক স্পেস থ্রু অ্যাকটিভ সিএসও পার্টিসিপেশন অ্যান্ড স্ট্রেংথেন্ড গভর্ন্যান্স সিস্টেম ইন বাংলাদেশ (ইসিএসএপি)” প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ও সঞ্চালনা করেন সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজ ফারজানা শারমিন এমপি। তিনি বলেন, “পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে, তবে তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর করা সম্ভব। তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “এই জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করা দান নয়—তাদের বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

জরিপ, দলীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার এবং গণমাধ্যম বিশ্লেষণ ইত্যাদি মিশ্র পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিচালিত ‘জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর জোরালো করা: নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ গবেষণার মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। এরপর গবেষণার সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেন সমষ্টির গবেষণা পরিচালক রেজাউল হক।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো গণমাধ্যমে অনিয়মিতভাবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনাভিত্তিকভাবে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা, কাঠামোগত বৈষম্য এবং সেবা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো জাতীয় আলোচনায় ধারাবাহিকভাবে জায়গা করে নিতে পারে না। একই সঙ্গে, সংবাদ উপস্থাপনায় প্রেক্ষাপট ও গভীরতার ঘাটতি এবং কমিউনিটির নিজস্ব কণ্ঠস্বরের সীমিত উপস্থিতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে গেছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক, বিচ্ছিন্ন এবং প্রকল্পভিত্তিক। ফলে টেকসই ও কৌশলগত সহযোগিতা গড়ে ওঠে না। অন্যদিকে, সময় ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা, সম্পাদনা নীতির প্রভাব এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার ঝুঁকিও সংবাদ কভারেজকে প্রভাবিত করে।

গবেষণায় পাওয়া সুপারিশে বলা হয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে কার্যকরভাবে জনপরিসরে তুলে ধরতে হলে নাগরিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও সমন্বিত ও কাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগকে কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা, প্রমাণভিত্তিক তথ্য ও গল্প উপস্থাপন জোরদার করা, স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতা ও অংশগ্রহণমূলক গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করা এবং তথ্যপ্রবাহকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য করা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার লায়লা জেসমিন বানু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

ইউনেস্কো বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইস বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি কমিউনিটি রেডিও ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা বাড়ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় মূলধারার গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

ক্রিশ্চিয়ান এইড-এর পার্টনারশিপ ও স্ট্র্যাটেজি লিড নুজহাত জাবিন বলেন, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার পাশাপাশি তাদের অর্জনগুলোও গণমাধ্যমে তুলে ধরা জরুরি।

এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মুহাম্মদ হিরুজ্জামান।

অন্যান্য বক্তারা নাগরিক সংগঠন, গণমাধ্যম, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো আরও সুসংগঠিতভাবে জনপরিসরে উঠে আসে এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।

অংশগ্রহণকারীরা গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নে বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ, সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।