প্রতিনিধি, খুলনা: এক্সিম ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার পারভিন সুলতানাকে পাঁচজন মিলে গণধর্ষণের পর হত্যা করে। এরকম দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জনাববন্দি দিয়েছে স্থানীয় যুবক মো. লিটন। সোমবার দুপুরে মহানগর হাকিম আয়শা আক্তার মৌসুমীর কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবার পর আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেছেন।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে নগরীর বুড়ো মৌলভীর দরগার পাশে তিন নং সড়কে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভিন সুলতানা (২৪) ও তার বৃদ্ধ পিতা ইলিয়াস চৌধুরীকে (৭০) হত্যা করা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান মিঠু জানান, রোববার রাতে গল্লামারি এলাকা থেকে মো. লিটনকে পুলিশ আটক করে। ওই এলাকায় তার বাড়ি। সে ঢাকায় সদরঘাট এলাকায় জুতার দোকানে চাকুরি করে। এলাকায় বখাটে এবং মাদকসেবী হিসাবে লিটনের দুর্নাম রয়েছে। সে পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে জোড়া হত্যার কথা স্বীকার করে এবং নিজের দোষ স্বীকার করে।
দুপুরের পর লিটনকে আদালতে আনা হয়। পরে মহানগর হাকিম আয়শা আক্তার মৌসুমীর খাস কামরায় জবানবন্দি দেয়া শুরু করে লিটন। লবনচোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশারেফ হোসেন জানান মো. লিটনের ১৬৪ ধারা লোমহর্ষক জবানবন্দি লিখতে গিয়ে মহানগর হাকিমের চোখেও পানি চলে আসে। তিনি জানান, মো. লিটন স্বীকার করেছে সে নিজেসহ মোট পাঁচ যুবক পারভিন সুলতানাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। লিটন জানায়, অনেকদিন থেকে তারা মেয়েটির ওপর নজর রাখছিল। মেয়েটিকে দুজন ধরে রাখে এবং একজন করে ধর্ষণ করে। মেয়েটিকে জোর করে বিবস্ত্র করা হয়। মেয়েটি বারবার চিৎকার করছিল- তোমার আমার সম্ভ্রম নষ্ট করো না, যত টাকা চাও সব টাকাই দিব। লিটন তার জবানবন্দিতে জানায়, দুজনের পর তৃতীয় নম্বরে সে নিজে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। প্রথমে ঘরে প্রবেশের পর পারভিন সুলতানার পিতা ইলিয়াস চৌধুরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তার পর তারা পারভীনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে।
লিটনের জবানবন্দির উদ্ধৃতি দিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, বাবা ইলিয়াস চৌধুরী ও মেয়ে পারভীন সুলতানা বুড়ো মৌলভীর দরগাহ সড়কের বাড়িতে গত তিন বছর আগে থেকে বসবাসের সূত্র ধরে লিটনসহ স্থানীয় বখাটেরা নানাভাবে তাদের উত্যক্ত করত। কেউ মেয়েকে যৌন হয়রানি আবার কেউ তার বৃদ্ধ বাবার কাছে অর্থ ধার চাইতো। এসব বিষয় নিয়েই বখাটেরা তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এর মধ্যে কয়েক মাস আগে পারভীন সুলতানা বুড়ো মৌলভীর দরগাহ সেতুতে উঠলে লিটন তার উড়না ধরে টান দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পারভীন নিজের হাতে থাকা টিফিন ক্যারিয়ার দিয়ে তাকে আঘাত করে। এতে সে প্রতিশোধ নেয়ার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে স্থানীয় আরো চারজনকে সাথে নিয়ে মোট পাঁচজন শুক্রবার মই দিয়ে দেয়াল পার হয়ে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। ওই সময় দরজা খোলা থাকায় তারা ঘরে ঢুকে প্রথমেই বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। তার চিৎকারে মেয়ে পারভীন এগিয়ে গেলে তাকে বিবস্ত্র করে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়।
ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর পরই তারা বাড়িতে মই দিয়ে প্রবেশ করে এবং রাত ৯টার পর বাইরে তালা দিয়ে চলে যায়। এর আগে তারা মেয়েটি ব্যাংক থেকে আসার পথে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে অশালীন প্রস্তাব দিত বলেও স্বীকার করে। মো. লিটন জানায়, তারা মেয়েটিকে ধর্ষণ করার জন্য মাসখানেক ধরে পরিকল্পনা করছিল। মেয়েটি তাদের পাত্তা না দেওয়ায় তার প্রতি ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মেয়েটি যেহেতু তাদের চিনতে পেরেছিল, তাই তারা ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পারভীনকে সেফটি ট্যাংকে ফেলে দেয়।
এর আগে পুলিশের কাছে লিটন জানায়, পারভিন সুলতানার ধর্ষণের চিত্র মোবাইলে ধারণ করা হয়েছে। পুলিশ সেই ভিডিও এবং বাকি চার যুবকের সন্ধান চালাচ্ছে । পারভীনের কম্পিউটারটি তারাই চুরি করেছে বলে স্বীকার করে।
এদিকে লবনচোরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরো জানান, বাকি চার আসামিকে ধরার জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
এদিকে, এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ভ্যান চালক নওয়াব আলীকে (৬০) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোমবার আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রোববার খুলনা মহানগর হাকিমের আদালতে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ।
