মৃত্যুকেই বেছে নিলো শারমিন!

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) থেকে মিলন কর্মকার রাজু: গলায় দড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বেছে নিলো সদ্য এসএসসি পাশ করা শারমিন আক্তার (১৬)। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার চাকামইয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চাকামইয়া গ্রামে রবিবার সকালে গোলা ঘরের আড়ার সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পরিবারের সদস্যরা। শারমিনের মৃত্যুর খবর এলাকাই ছড়িয়ে পড়লে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তার স্কুলের সহপাঠীসহ শতশত মানুষ ছুটে আসে তাদের বাসায়। শোকাচ্ছন্ন পরিবারের সদস্যসহ তার সহপাঠীরাও এই মুত্যুর জন্য জাকারিয়া ও তার পরিবারকে দায়ী করেন। খবর পেয়ে পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।

পশ্চিম চাকামইয়া গ্রামের মজিবর হাওলাদারের তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে একমাত্র কন্যা শারমিন তারিকাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৪ পেয়ে এবার এসএসসিতে উত্তীর্ণ হয়। তাঁকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। ইচ্ছা ছিল ভালো কলেজে ভর্তি করবেন। কিন্তু একই বিদ্যালয় থেকে পাস করা শারমিনের সহপাঠী জাকারিয়ার প্রতারণায় শারমিন আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় গ্রামবাসী ও শারমিনের সহপাঠীরা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে শারমিন ও জাকারিয়ার প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। বিষয়টি এলাকার সবাই জানে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ছুঁইয়ে শারমিনকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয় জাকারিয়া। এসএসসি পরীক্ষার পর শারমিনের পরিবার একই গ্রামের জাকারিয়ার পিতা ক্বারী রুহুল আমিনের কাছে তাদের দু’জনের বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মেয়ে ভালো না এই অপবাদ দিয়ে বিয়ে প্রত্যাখান করেন তিনি। এ ঘটনার পরই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে শারমিন। কিন্তু তাঁদের দু’জনের মধ্যে মোবাইলে ঠিকই যোগাযোগ হতো।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো.রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ঘটনার আগের দিন জাকারিয়া মোবাইলে শারমিনকে বিয়ে করবে না এবং তাদের কোনও সম্পর্ক নেই- এ কথা বলে প্রেমের সম্পর্ক অস্বীকার করায় শারমিন লজ্জা ও ক্ষোভে আত্মহত্যা করেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন।

শারমিনের চাচা নজরুল হাওলাদার প্রথমে দেখতে পান শারমিনের ঝুলন্ত লাশ। তিনি বলেন, ঘরে ঢুকতে গিয়ে দড়জা বন্ধ দেখে ডাকাডাকির একপর্যায়ে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে বাহির থেকে মই বেয়ে জানালা দিয়ে দেখি ঘরের আড়ার সাথে ঝুলছে শারমিন। তাৎক্ষনিক দড়জা ভেঙ্গে তাকে নামানোর আগেই মৃত্যু হয় শারমিনের।

শারমিনের পিতা মজিবর হাওলাদার বলেন, ‘স্বপ্ন আছিলো মাইয়াডারে ল্যাহাপড়া করামু। কিন্তু কি হইয়া গ্যালো। আমার মাইয়া মরতে পারে না। তারে মরতে বাধ্য করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিয়ার প্রস্তাব লইয়া গ্যাছিলাম। হেইসময় বিয়া হইওলে আইজ মাইয়াডারে গলায় দড়ি দিয়া ঝুলতে হইতো না। পোলায়ওতো রাজি আছিলো। কি এমন বল্লো যে মাইয়াডা মইর‌্যা গ্যালো। আমি এইয়ার বিচার চাই।’

মেয়েকে হারিয়ে শোকে পাথর তার মা হিরু বেগম। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘ভোরে অওে (শারমিন) বিছানায় ঘুমাইন্না দেইখ্যা আমি থালাবাসন ধুইতে গেছি। কিন্তু পুকুর পাড়ে বইয়া হুনি মাইয়া গলায় দড়ি দেছে।’

চাকামইয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো.হুমায়ুন কবির কেরামত জানান, জাকারিয়া ও তার পরিবারের কারনেই শারমিন আত্মহত্যা করেছে বলে তিনি তার পরিবারের সাথে কথা বলে জেনেছেন। বিষয়টি তদন্ত করলেই বের হয়ে যাবে।

কলাপাড়া থানার ওসি (তদন্ত) মো.মনিরুজ্জামান জানান, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে ৪/৫ জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের পিতা মজিবর হাওলাদার মামলা দায়ের করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম আপাতত প্রকাশ করা যাবে না। তবে আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান।