রতন সিং, দিনাজপুর: দিনাজপুরে ইতালীয় নাগরিক ডা. পিয়েরো পিচমকে মাথার পিছনে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেছে অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা।
আহত পিচম শঙ্কামুক্ত হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিকেলে তাকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
ডা. পিচম শহরের সুইহারী ক্যাথলিক চার্চে অবস্থান করতেন। ডাক্তার হলেও তিনি ছিলেন ধর্মযাজক।
হামলাকারীদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
আজ বুধবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটে দিনাজপুর শহরের মির্জাপুরে বিআরটিসি’র ডিপোর দু’শ গজ দূরে এবং ল্যাপ্রসি মিশন বাংলাদেশের অফিসের সামনে মোটরসাইকেল আরোহী তিন দুর্বৃত্ত পিয়েরো পিচমকে (৫১) লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

গুলিটি পিচমের ঘাড়ের কিছু উপরে বাম দিক দিয়ে প্রবেশ করে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাইসাইকেল যোগে ডা. পিচম দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই রোগীকে দেখার জন্য যাওয়ার পথে আক্রান্ত হন।
গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দা খতিবুদ্দিন আহমেদ বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখেন রাস্তার উপরে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। প্রায় শতাধিক মানুষ দৃশ্যটি দেখলেও কেউ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। স্থানীয় বাসিন্দা খতিবুদ্দিন ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক বাবুল হোসেন আহত ইতালীয় নাগরিককে অটোরিকশায় করে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ (দিমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
দিমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. তরুণ কান্তি হালদার জানান, গুলিতে আহত ইতালীয় নাগরিক পিচমের কোনো অপারেশন করা হয়নি। তবে ড্রেসিং করা হয়েছে। তিনি জানান, ব্রেন মেটারে (মগজে) কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। নাকের গোড়ার কিছু হাড় ভেঙে যেতে পারে। সেখানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পরিচালক আরো জানান, তার সিটিস্ক্যান করা হয়েছে। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত। তবুও মাথার আঘাতের রোগীদের ৪৮ ঘন্টার অবজারভেশনে রাখার পর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়। ডা. তরুন কান্তি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামরিক সচিব তাকে বিদেশি নাগরিকের চিকিৎসার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডা. পিচমকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এই হামলার নিন্দা জানিয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও দিমেকের পরিচালকের সাথে একাধিকবার কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
হামলাস্থলের দু’শ গজ দূরের চায়ের দোকানদার নুরুল ইসলাম ও তার মেয়ে শিউলি জানান, সকাল ৮টা ১০ মিনিটে তিনজন মোটরসাইকেল আরোহী এই হামলা চালায়। তারা একটি গুলির শব্দ শুনেছেন। হামলাকারীদের একজনের মাথায় হেলমেট ও অপর দুজনের মুখ চাদর দিয়ে ঢাকা ছিল। তিন হামলাকারী গুলিবর্ষণের পর মোটরসাইকেল নিয়ে মসজিদের সামনের গলি দিয়ে পালিয়ে যায়। তারা জানান, ডা. পিচম প্রায়শ সাইকেল নিয়ে এই পথ দিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতেন।
ঘটনার ১০/১৫ মিনিট পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এনএম নাসিরউদ্দিন তার সদস্যদের নিয়ে হামলাস্থলে এসে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন। তিনি ফিতা দিয়ে এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। হামলাস্থলের তিন জায়গায় জমাট বাঁধা রক্ত দেখা যায়। পিবিআই কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে ডা. পিচমের ব্যবহৃত চশমা, বাইসাইকেল ও এ্যাশকালারের কাপরের তৈরি মাস্ক উদ্ধার করেন। এসময় সেখান থেকে পিস্তলের ৯এমএম গুলির একটি খোসা উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর পর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমান, কোতয়ালী থানার ওসি খালেকুজ্জামান পিপিএম, ওসি (তদন্ত) আবুল হাসনাত, র্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা হামলাস্থল পরিদর্শন করেন।
সুইহারী ক্যাথলিক চার্চের ফাদার ইনচার্জ জান বাতিস্তা জানকি জানান, পিয়েরো পিচম একজন ডাক্তার হলেও তিনি ছিলেন ধর্মযাজক ফাদার। ১৯৮৭ সালে তিনি ইতালির লেককো শহর থেকে বাংলাদেশে আসেন ধর্মযাজক হিসেবে। প্রায় ২৮ বছরের মধ্যে তিনি বেশিরভাগ সময় ছিলেন রাজশাহীতে। ২০০৮ সালে ডা. পিচম দিনাজপুরে আসেন এবং সুইহারী ক্যাথলিক চার্চে অবস্থান করতেন। প্রতি শনি ও রোববার তিনি প্রার্থনাসভা পরিচালনা করতেন। একজন যক্ষ্মা বিষয়ক ডাক্তার হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে। তিনি দিমেক হাসপাতাল ও সেন্টভিনসেন্ট হাসপাতালে রোগী দেখতেন। বাতিস্তা জানান, ডাক্তার হলেও পিচম ইন্টারনেট, ফেসবুক ও কোনো ধরনের ছবি তুলতেন না। তার কোনো ছবি নেই। ফাদার ইনচার্জ জানান, বর্তমানে ১১ জন ইতালীয় নাগরিক দিনাজপুরে রয়েছেন। এর মধ্যে সাতজন সুইহারী চার্চে, সেন্টভিনসেন্ট হাসপাতাল ও বোচাগঞ্জের মহেশপুর চার্চে দুজন করে চারজন ইতালীয় নাগরিক কর্মরত রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম বলেন, এই জঘন্য হামলার সাথে যারা জড়িত তাদের খুঁজে আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে কঠোর সাজা দেয়া হবে। তিনি বলেন, বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
