প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে গণমাধ্যম–নাগরিক সংগঠনের শক্তিশালী ভূমিকার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা ও অভিজ্ঞতা জনপরিসরে যথাযথভাবে তুলে ধরতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে শক্তিশালী ও ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেছেন, প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা দৃশ্যমান করতে প্রমাণভিত্তিক ও অধিকার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা বাড়াতে হবে।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে মিলনায়তনে বুধবার (১১ মার্চ) ‘সিএসও–গণমাধ্যম সহযোগিতা: প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলা হয়।

গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিষয়ক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সমষ্টি, সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি ও ঢাকা ট্রিবিউনের অংশীদারত্বে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশের সহায়তায় ‘নাগরিক পরিসর সম্প্রসারণ ও সুশাসন শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় এ আয়োজন করা হয়।

ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান। তিনি বলেন, “নাগরিক পরিসর কেবল আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিষয় নয়। জনআলোচনায় কারা দৃশ্যমান এবং কারা অনুপস্থিত, সেটিও নাগরিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

তিনি আরও বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা জাতীয় গণমাধ্যমে খুব কমই উঠে আসে। ফলে তাঁদের সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণী আলোচনায়ও অনেক সময় অনুপস্থিত থেকে যায়। এই ব্যবধান কমাতে গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা জরুরি।”

গোলটেবিলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিক পরিসর সম্প্রসারণের জন্য গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনের সহযোগিত বিষয়ে পরিচালিত জাতীয় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন সমষ্টির গবেষণা ও যোগাযোগ পরিচালক রেজাউল হক।মিশ্র পদ্ধতিতে পরিচালিত গবেষণার আওতায়  জরিপে অংশ নেওয়া ৬৮ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য মনে করেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো গণমাধ্যমে খুব কম বা একেবারেই আসে না। আবার ৬৪ শতাংশ মনে করেন, তাঁদের সমস্যাকে গণমাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। এছাড়া ৫৮ শতাংশ  উত্তরদাতা মনে করেন তাঁদের জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো গণমাধ্যমে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয় না।

আলোচকেরা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক নারীদের গণমাধ্যমে কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁদের নেতৃত্ব, সক্ষমতা বা অধিকারভিত্তিক ভূমিকা তুলনামূলক কম উঠে আসে। ফলে গণমাধ্যমে আরও সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেদনের প্রয়োজন রয়েছে।

রিয়াজ আহমদ বলেন, “গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনের মধ্যে নিয়মিত ও অর্থবহ যোগাযোগ থাকলে মাঠপর্যায়ের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা আরও ভালোভাবে সামনে আসবে।”

আলোচনায় আরও বলা হয়, জেলা পর্যায়ের গণমাধ্যম স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে জেলা পর্যায়ের গণমাধ্যমের যোগাযোগ এখনও সীমিত। এই সংযোগ জোরদার করা গেলে স্থানীয় বাস্তবতাগুলো জাতীয় আলোচনায় আরও বেশি জায়গা পেতে পারে।

গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা, ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশের পার্টনারশীপ এন্ড ষ্ট্রাটেজলীড নুজহাত জাবিন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, উই ক্যান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক, সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর একেএম নাসিম, চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান, চ্যানেল আইয়ের  প্রধান নিবার্হী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, বাংলাভিশনের বার্তা সম্পাদক সালমা ইয়াসমিন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, রেডিও পল্লীকণ্ঠের স্টেশন ম্যানেজার মেহেদী হাসান, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মনিকা সরেন, কাবেরী সুলতানা ও সুস্স্থ জীবনের সাধারন সম্পাদক তনুশ্রী আহমেদ এ্যামি প্রমুখ।

আলোচকেরা বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে জাতীয় আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করতে গণমাধ্যম, সিভিল সোসাইটি, একাডেমিয়া ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সহযোগিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।