জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং বৈশ্বিক নানা সংকটের প্রেক্ষাপটে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি বাসযোগ্য ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং পরিবার— সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।‘
“শৈশবের জন্য করণীয়: শৈশব এবং ধরিত্রীকে সুরক্ষিত রাখা“ বিষয়ে নীতি সংলাপে বক্তারা বলেন, আজকের শিশুদের নিরাপদ, সুস্থ ও বিকাশবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ—দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শিশুদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পৃথিবীকেও নিরাপদ রাখতে হবে।
বাংলাদেশ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন) এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ নীতি সংলাপে সহযোগী হিসেবে ছিল আরনেক এবং সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল চ্যানেল আই।
নীতি সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশে বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিশুদের নিরাপদ ও বিকাশবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেতনতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগ, কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রকৃতি বন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, একটি শক্তিশালী ও মানবিক জাতি গঠনের জন্য যেমন শিশুদের যত্ন, সুরক্ষা ও বিকাশ নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আজকের শিশুর প্রতি যত্নই আগামীর উন্নত সমাজ গড়ে তুলবে, আর আজকের ধরিত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
নীতি সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন)-এর সহ-সভাপতি মাহমুদা আক্তার। তিনি বলেন, শিশুর জন্মের পর থেকে প্রথম এক হাজার দিন তার শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় যথাযথ পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পরিচর্যা, স্নেহপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ এবং প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে একটি শিশুর সারাজীবনের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই এই সময়কে কেন্দ্র করে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
আলোচনায় অংশ নেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের চিফ অব এডুকেশন দীপা শঙ্কর, ইউনেস্কোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. সুজান ভাইজ, প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের পরিচালক ড. সৈয়দ কামরুল ইসলাম, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব, সিনারগোজের কান্ট্রি ডিরেক্টর এশা হুসেইন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এস এম রহমতউল্লাহ ভূঁইয়া, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডিরেক্টর-ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস নিশাত সুলতানা সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এম খায়রুল কবির, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এর স্কুল অব প্রাইমারি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ এর ডিন ড. কামরান উল বাসেত ও এনভায়রন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক-এর কোষাধ্যক্ষ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান মাশরেকি, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এর উপপরিচালক মিস রওফা খানম, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম হেড সৈয়দা সাজিয়া জামান, বিজিএমইএ-এর পরিচালক ও মাকসা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (কনসোর্টিয়াম ইউনিট) পরিচালক মিস ফাহিমা আক্তার। অনলাইনে যুক্ত হয়ে আলোচনায় অংশ নেন বেন এর চেয়ারপারসন ড. মনজুর আহমেদ।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অনেক পরিবার এখনো শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশের গুরুত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নয়। ফলে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসম্মত পরিচর্যা, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সক্ষমতা উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে সেবার সম্প্রসারণ এবং কার্যকর জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, একটি শিশুর সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং মানসিক বিকাশ—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব শিশুদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে উল্লেখ করে তারা শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে, সরকারের একার পক্ষে শিশুদের সার্বিক কল্যাণ ও পরিবেশ সুরক্ষার সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তারা।
মুকিত মজুমদার বাবুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ নীতি সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা শিশু ও ধরিত্রী—উভয়ের সুরক্ষাকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ লক্ষ্যে কার্যকর ভূমিকা পালন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
