প্রবাসীদের হয়রানি সমাধানে বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা করবে সরকার-আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান

প্রবাসীদের হয়রানি, ভোগান্তিসহ যেকোন ধরনের সমস্যা সমাধানে বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা করবে সরকার। বিদেশে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাদের বৈধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দিবে সরকার। এ ক্ষেত্রে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবাসীদের হয়রানি, ভোগান্তিসহ যেকোন ধরনের সমস্যা সমাধানে বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা করবে সরকার। বিদেশে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বৈধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দিবে সরকার। এ ক্ষেত্রে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আজ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) ত্রিশ বছর উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী আয়োজিত সম্মেলনে প্রথম অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। জোরপূর্বক ও স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি নিয়ে কাজের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’ আয়োজন করেছে রামরু।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রামরুর উপনির্বাহী পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহ ও পরিচালক (প্রোগ্রাম) মেরিনা সুলতানা। সম্মেলনের প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন রামরুর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক ও ঢাকায় সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ডিয়েপাক এলমার। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের অধ্যাপক ড. নিল অ্যাডজার শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন।

সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রবাসীদের হয়রানি ও আইনি জটিলতা কমাতে বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদেশে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি কর্মীর বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাদের বৈধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া দরকার। এ জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আইনমন্ত্রী বলেন, কঠোর পরিশ্রম করেও অনেক শ্রমিক পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পান না। তাদের কর্মপরিবেশ, আবাসন, নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে গিয়ে যারা আইনি জটিলতায় পড়েন, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়াও জরুরি।

রামরুর তিন দশকের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, অভিবাসীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। অভিবাসীদের সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধানের উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান এবং তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় এসব খাত ধরে কাজ করছে সরকার।

তিনি বলেন, প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম চলছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের মৌলিক তথ্য সংরক্ষণ, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে সেবা গ্রহণ এবং দেশে ফিরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

দেশে ফিরে জমিজমা-সংক্রান্ত সমস্যায় পড়া প্রবাসীদের দ্রুত সেবা দেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে সাত দিনের মধ্যে, প্রয়োজনীয় সেবা বা প্রতিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে কার্যকর করার পাশাপাশি ঋণসুবিধার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকটি থেকে প্রবাসীদের তিন লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। দেশে ফিরে যারা ব্যবসা করতে চান, নতুন উদ্যোগ নিতে চান কিংবা বাড়ি নির্মাণ করতে চান, তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রামরুর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার বলেন, অভিবাসন খাতকে এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম  ও পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন। অতীতের ন্যায় সীমিত আকারে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবেনা।

সম্মেলনের প্রথম দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্থানান্তর, অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের জীবন ও জীবিকার সংকট, শ্রম অভিবাসন, মানব পাচার এবং প্রবাসী আয় নিয়ে পৃথক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, গবেষণার ফলাফল এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মানুষের চলাচল ও স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের অধ্যাপক ড. নিল অ্যাডজার। আগামী দশকে অভিবাসন ও প্রবাসী আয়প্রবাহের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন রাথা গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. দিলীপ রথা।

এ ছাড়া অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় তরুণ গবেষকদের ফোরাম, অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা কমিটি, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিযোজন অধিকার কমিটির কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। শ্রম অভিবাসন ও মানব পাচারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন সংশ্লিষ্ট গবেষক ও উন্নয়নকর্মীরা।

সম্মেলনে রামরুর ৩০ বছরের কার্যক্রম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং স্মারক গ্রন্থের ইলেকট্রনিক সংস্করণ উন্মোচন করা হয়। আয়োজক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে রামরু ১০০টির বেশি গবেষণা পরিচালনা করেছে, ১৩টি জাতীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে অবদান রেখেছে এবং দেশের ২১ জেলায় অভিবাসীদের অধিকারভিত্তিক সেবা দিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা ও অভিবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের ওপর সম্মিলনে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, দিনব্যাপী আয়োজনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসন নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. মাশফিকুস সালেহীন। এসময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মানুষের চলাচল ও স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জ এবং আগামী দশকের সম্ভাব্য প্রবণতা নিয়ে বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের মানবভূগোলের অধ্যাপক ড. নিল অ্যাডজার। অন্যদিকে, আগামী দশকে অভিবাসন ও প্রবাসী আয়প্রবাহের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন রাথা গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. দিলীপ রথা।

আরেক সেশনে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় রামরুর বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এতে তরুণ গবেষকদের ফোরাম, অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা কমিটি, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিযোজন অধিকার কমিটির কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। এ পর্বে সঞ্চালনা করেন আইজেনহাওয়ার ফেলো ও উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তা খাতের নির্বাহী শশাঙ্ক সাদী।

জলবায়ুজনিত অভিবাসী ও শ্রম অভিবাসন নিয়ে পৃথক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় বিকেলে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিজ দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত মানুষের অনিশ্চিত জীবনযাপন, সংকট ও কল্যাণের বিষয়গুলো নিয়ে নতুন গবেষণা এবং এসব গবেষণার মাধ্যমে অভিবাসন বিষয়ে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার সহযোগী অধ্যাপক ড. মার্ক টেবোথ। আলোচনায় ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।

পরে শ্রম অভিবাসন ও মানব পাচারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বাংলাদেশ কার্যালয়ের মাইগ্রেশন পলিসি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের প্রধান ড. ইশিতা শ্রুতি। এতে আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিমড) ড. আমিনা মহার্জন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার এবং ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম আলোচক হিসেবে অংশ নেন।

এছাড়া এতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম বিষয়ক উন্নয়ন সংগঠন সমষ্টি, গণমাধ্যম প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।